শেখ সাদ আহমদ আমিন বর্ণভী :

বাপ কা বেটা, সিপাহি কা ঘোড়া — বংশীয় গৌরব, ইলম ও আদবের এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি।
উস্তাদে মুহতারাম শেখ সাদ আহমদ আমিন বর্ণভী যেন এক সুবিশাল বটবৃক্ষের ছায়াতলে বেড়ে ওঠা সজীব চারাগাছ। আদব-আখলাক, চলাফেরা, তাকওয়া, ইলম ও ব্যক্তিত্বে তিনি তাঁর পিতা ও দাদারই এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়।
১৯৯২ সালের ৫ জানুয়ারি শ্রীমঙ্গলের ঐতিহ্যবাহী বরুণা গ্রামের সম্ভ্রান্ত “হামীদী ফ্যামিলি”-তে তাঁর জন্ম। পিতা যুগশ্রেষ্ঠ বুযুর্গ মুফতি রশিদুর রহমান ফারুক বর্ণভী, আর দাদা ছিলেন আল্লামা লুৎফর রহমান বর্ণভী রহমাতুল্লাহি আলাইহি; যিনি আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা ও আমীর ছিলেন।
নানা ছিলেন খলীফায়ে মাদানী ড. আলী আসগর নুরি চৌধুরী রহমাতুল্লাহি আলাইহি। এমন দ্বীনি পরিবেশে বেড়ে ওঠার কারণেই ছোটবেলা থেকেই তাঁর অন্তরে ইলম ও আমলের প্রতি গভীর ভালোবাসা জন্ম নেয়।
শিক্ষাজীবন।
তাঁর শিক্ষার সূচনা হয় মা-বাবার স্নেহময় তত্ত্বাবধানে। মক্তব ও নূরানী শিক্ষা লাভ করেন নিজ দাদার প্রতিষ্ঠিত “মসজিদে বর্ণভী”-তে। এরপর ১৯৯৭ সালে ঐতিহ্যবাহী বরুণা মাদরাসায় নূরানী দ্বিতীয় বর্ষে ভর্তি হন।
২০০০ সালে হিফয বিভাগে ভর্তি হয়ে ২০০৩ সালে অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে হিফয সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে জামাতে সরফ থেকে জালালাইন পর্যন্ত বরুণা মাদরাসায় সুনামের সঙ্গে অধ্যয়ন করেন। জানা যায়, নাহবেমীর ও মুখতাসার জামাতে তিনি বেফাকের মেধাতালিকায় স্থান অর্জন করেছিলেন।
উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি রাজধানী ঢাকার ঐতিহ্যবাহী মালিবাগ মাদরাসায় গমন করেন এবং ২০১১ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত মিশকাত ও দাওরায়ে হাদীস সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে দারুল উলূম দেওবন্দ সফর করে বুযুর্গদের সোহবত লাভ করেন।
শিক্ষকতা ও খেদমত।
দেওবন্দ থেকে ফিরে এসে তিনি পিতার হাতেগড়া প্রতিষ্ঠান শেখবাড়ী জামিয়ায় শিক্ষকতা শুরু করেন। আজও তিনি সেখানে সহীহ বুখারী ও মিশকাত শরীফের দরস প্রদান করে যাচ্ছেন। তাঁর দরস যেমন হৃদয়গ্রাহী, তেমনি প্রভাবশালী। অসংখ্য ছাত্র তাঁর নিকট থেকে ইলমের আলো গ্রহণ করছে।
তিনি শিক্ষকতাকে কেবল পেশা মনে করেন না; বরং একে নববী দায়িত্ব হিসেবেই গ্রহণ করেছেন। ছাত্রদের প্রতি তাঁর স্নেহ, মমতা ও আন্তরিকতা সত্যিই বিরল। দুর্বল ও অসচ্ছল ছাত্রদের সহযোগিতায়ও তিনি সদা অগ্রগামী।
তিনি শুধু কিতাবের জ্ঞানই দান করেন না; বরং আদব, আখলাক, আমল ও আত্মশুদ্ধির শিক্ষাও প্রদান করেন। তাঁর মজলিসে বসলেই হৃদয়ে এক অনাবিল প্রশান্তি অনুভূত হয়।
বর্তমানে তিনি বরুণা মাদরাসার মুহাদ্দিস, শেখবাড়ী জামিয়ার নায়েবে মুহতামিম এবং মৌলভীবাজারের মিশকাতুল কুরআন মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপালসহ একাধিক দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন।
দ্বীনি আন্দোলন ও সমাজ সংস্কার।
তিনি কোনো প্রচলিত রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। বরং অরাজনৈতিক দ্বীনি সংগঠন আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব এবং ফয়জে বর্ণভী সাবাহী মক্তব বোর্ড বাংলাদেশের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ওয়াজ-নসিহত, ইসলাহী বয়ান, সমাজ সংস্কার ও মানুষের মাঝে দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছে দিতে তিনি সিলেট বিভাগসহ দেশব্যাপী সফর করে চলেছেন। তাঁর বয়ানে পিতা ও দাদার প্রভাব সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। এ কারণেই অনেকে তাঁকে “ওলি ইবনে ওলি” উপাধিতে অভিহিত করেন।
তাকওয়া ও আমল।
তিনি অত্যন্ত পরহেজগার ও আমলনিষ্ঠ ব্যক্তি। বিশেষ করে ছবি তোলার ব্যাপারে তিনি অত্যন্ত সতর্ক। কেউ ছবি তুলতে চাইলে তিনি তা অপছন্দ করেন এবং নিষেধ করেন।
রাতের তাহাজ্জুদ, জিকির-আজকার ও ইবাদতের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ ছাত্রদের হৃদয়ে বিশেষ প্রভাব ফেলে। শেখবাড়ী জামিয়ার শবগুজারির শেষ রাত্রিতে তাঁর জিকিরে মুখরিত পরিবেশ সত্যিই হৃদয়স্পর্শী।
ব্যক্তিগত অনুভূতি।
আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি যে, এমন মহান উস্তাদের সান্নিধ্য লাভ করেছি। তাঁর প্রতিটি কথা, নসিহত ও দিকনির্দেশনা আমার শিক্ষা জীবনের পাথেয়। তিনি শুধু একজন শিক্ষক নন; বরং একজন পথপ্রদর্শক, আদর্শ ও আত্মিক অভিভাবক। তাঁর তাকওয়া, বিনয় ও ইখলাস আমাকে প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত করে।
اللهم طوِّل عمر شيخنا، وبارك في حياته،
وانفع به العباد والبلاد،
وارزقه الصحة والعافية،
وأدم عليه نور العلم والعمل،
.آمين يا رب العالمين